প্রিন্ট এর তারিখ : ০২ নভেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০১ নভেম্বর ২০২৬
২১ বছরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, সংকট পেরিয়ে সম্ভাবনার পথে
রাইজুল ইসলাম , জবি প্রতিনিধি ||
পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। দীর্ঘ দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার ধারাবাহিকতা বহন করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। ১৮৫৮ সালে ‘ঢাকা ব্রাহ্ম স্কুল’ নামে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠান নানা পরিবর্তন ও বিবর্তনের মধ্য দিয়ে আজকের বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ২১ বছর পূর্ণ করে আগামীকাল ২ নভেম্বর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপন করতে যাচ্ছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৮৭২ সালে ঢাকা ব্রাহ্ম স্কুলের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় জগন্নাথ স্কুল। পরবর্তী সময়ে শিক্ষার প্রসার ও প্রতিষ্ঠানটির সুনাম বিবেচনায় ১৮৮৪ সালে জগন্নাথ রায় চৌধুরীর ছেলে কিশোরী লাল রায় চৌধুরী এটিকে কলেজে উন্নীত করেন। তখন এর নাম হয় ঢাকা জগন্নাথ কলেজ। এর আগে প্রয়াত জগন্নাথ রায় চৌধুরী ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা।১৮৮৭ সালে শিক্ষা বিভাগের নির্দেশে স্কুল ও কলেজ শাখা পৃথক করা হয়। পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে জগন্নাথ কলেজে স্নাতক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ হয়ে যায়। তখন প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল ‘জগন্নাথ ইন্টারমিডিয়েট কলেজ’। দীর্ঘ ২৮ বছর পর ১৯৪৯ সালে পুনরায় কলেজটিতে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়।এরপর ১৯৬৮ সালে জগন্নাথ কলেজ সরকারি করা হয় এবং ১৯৭৫ সালে চালু হয় স্নাতকোত্তর কোর্স। ১৯৯১-৯২ শিক্ষাবর্ষ থেকে কলেজটির শিক্ষা কার্যক্রম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবর্তে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত হতে থাকে।দীর্ঘ পথপরিক্রমার পর ২০০৫ সালের ২০ অক্টোবর কলেজটিকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০০৫-এর আওতায় ২০০৫-২০০৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে সব বিভাগে সেমিস্টার পদ্ধতিতে পাঠদান শুরু হয়। বর্তমানে সাতটি অনুষদের অধীনে ৩৮টি বিভাগ ও দুটি ইনস্টিটিউট নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম। এখানে অধ্যয়ন করছেন ১৩ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী।শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশাঃ আবাসন ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর দাবিবিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে দুই দশকের বেশি সময় পার করলেও শিক্ষার্থীদের নানা প্রত্যাশা ও সীমাবদ্ধতা এখনো রয়ে গেছে। বিশেষ করে আবাসন সংকট, শ্রেণিকক্ষের স্বল্পতা, পরিবহন সুবিধা এবং গবেষণার পর্যাপ্ত সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি দীর্ঘদিনের। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নেও প্রশাসন কার্যকর উদ্যোগ নেবে।বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের শিক্ষার্থী ইমতিয়াজ উদ্দিন মাহিন বলেন, ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্য আমাদের গর্বের জায়গা। কিন্তু শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধা না থাকায় অনেককে প্রতিদিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ক্যাম্পাসে আসতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে আমাদের প্রত্যাশা, আবাসন সংকট নিরসন এবং শিক্ষার্থীদের মৌলিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রশাসন আরও কার্যকর ভূমিকা রাখবে।’অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী তাবাসসুম আক্তার ঐশি বলেন , ‘আমরা চাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শুধু অবকাঠামোগত দিক থেকেই নয়, শিক্ষা, গবেষণা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমেও দেশের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হোক। আধুনিক ল্যাব, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ ও গবেষণার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। নতুন ক্যাম্পাসের কাজ দ্রুত এগিয়ে গেলে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের অনেক প্রত্যাশা পূরণ হবে।’নতুন ক্যাম্পাস ঘিরে আশার আলোজগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি একটি পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক ক্যাম্পাস। সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়নে কেরানীগঞ্জে এগিয়ে চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস স্থাপনের কার্যক্রম। নতুন ক্যাম্পাস প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসনের পাশাপাশি শিক্ষা, গবেষণা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য বিস্তৃত সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের ভূমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন (প্রথম সংশোধিত) প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পের বাস্তবায়ন কার্যক্রমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৫ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন যুক্ত রয়েছে।সর্বশেষ গত অক্টোবরে দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ ও বহিঃসড়ক, পেরিফেরাল সারফেস ড্রেন, প্রধান ফটক, সম্মুখ সীমানাপ্রাচীর এবং সাবস্টেশন নির্মাণের নকশা যাচাই ও চূড়ান্তকরণ নিয়ে ত্রিপক্ষীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে ২০২৬ এর সেপ্টেম্বরে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) এক সভায় চলমান নির্মাণকাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং প্রকল্পের বিভিন্ন বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।এ ছাড়া গত জুলাইয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) প্রতিনিধি দল দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের নির্মাণাধীন বাণী ভবন ও ড. হাবিবুর রহমান ভবন পরিদর্শন করেন। ওই সময় চলমান কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ এর মধ্যে নির্ধারিত নির্মাণকাজ শেষ করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়।দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের নির্মাণকাজের এই অগ্রগতি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। দীর্ঘদিনের আবাসন সংকট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস গড়ে উঠবে—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সবার। শিক্ষার্থীদের আশা, পরিকল্পিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশে নতুন মাত্রা যুক্ত হবে।সব মিলিয়ে ১৮৫৮ সালে একটি স্কুল হিসেবে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি সময়ের বিবর্তনে কলেজ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অর্জনের ধারাবাহিকতায় ২১ বছরের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে নতুন ক্যাম্পাস ঘিরে এখন নতুন স্বপ্ন দেখছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
কপিরাইট © ২০২৬ ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত