প্রিন্ট এর তারিখ : ২৮ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৮ মে ২০২৬
কুরবানি হোক কেবল রবের উদ্দেশ্যেইা
নাবিলা বিনতে হারুন, শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ||
পবিত্র
কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আল্লাহর দরবারে কোরবানির গোশত ও রক্ত
কোনো কিছুই পৌঁছায় না, পৌঁছায় শুধু
তোমাদের তাকওয়া।' (সূরা হজ, আয়াত-৩৭)।ঈদুল
আযহা আমাদের জীবনে শুধু উৎসবের বার্তা
নিয়ে আসে না-এটি
নিয়ে আসে আত্মত্যাগ, আনুগত্য
ও তাকওয়ার এক গভীর শিক্ষা।
কুরবানি কোনো সামাজিক প্রতিযোগিতা
নয়, এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি
অর্জনের এক মহান ইবাদত।
তাই কুরবানির মূল চেতনা হওয়া
উচিত—কেবল রবের উদ্দেশ্যে।
কুরবানি কী? 'কুরবানি'
শব্দটি আরবি 'কুরবান' (قربان) থেকে এসেছে। এর
শাব্দিক অর্থ হলো—নিকটবর্তী
হওয়া, সান্নিধ্য লাভ করা বা
আল্লাহর নৈকট্য অর্জন। অর্থাৎ, কুরবানির মাধ্যমে বান্দার মহান রাব্বুল আ'লামিনের নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের
চেষ্টা করা।ইসলামী
পরিভাষায় কুরবানিকে “উযহিয়া” বলা হয়। এটি
মূলত হয়রত ইব্রাহিম (আ.)
ও হয়রত ইসমাইল (আ.)এর মহান ত্যাগ
ও ধৈর্য্যের স্মৃতিবাহী ইবাদত।
কুরবানির প্রেক্ষাপট আল্লাহর
অশেষ রহমতে ৮৬ বছর বয়সে
সন্তানের পিতা হন হযরত
ইব্রাহিম (আ.)। বিবি
হাজেরার গর্ভে জন্ম হয় হযরত
ইসমাইল (আ.) এর। কিন্তু
আল্লাহ তায়ালা স্বপ্নের মাধ্যমে নির্দেশ দিলেন প্রিয় বস্তু তথা স্বীয় পুত্র
ইসমাইলকে কুরবানি করার। হযরত ইব্রাহিম (আ.)
সিদ্ধান্ত নিলেন আল্লাহর নির্দেশ পালন করার। চলতে
চলতে পুত্রকে জানালেন আল্লাহর হুকুমের কথা। পবিত্র কুরআনে
এসেছে, আল্লাহ তাআলা বলেন-'অতঃপর যখন সে (ইসমাঈল)
তার পিতার সঙ্গে চলাফেরার বয়সে পৌঁছল, তখন
ইবরাহিম বললেন, ‘হে আমার প্রিয়
পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখেছি
যে, তোমাকে জবাই করছি।’ উত্তরে
সে বলল, ‘হে আমার পিতা!
আপনাকে যা আদেশ করা
হয়েছে আপনি তা-ই
করুন। ইনশাআল্লাহ, আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।'( সূরা আস-সাফফাত:
১০২)হযরত
ইব্রাহিম (আ.) পুত্র ইসমাইলকে
কুরবানি করার উদ্দেশ্যে মাটিতে
শুইয়ে দিলেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাদের ধৈর্য্য এবং আত্মত্যাগের চেষ্টায়
সন্তুষ্ট হয়ে ইসমাইল (আ.)
এর স্থানে একটি দুম্বা পাঠিয়ে
দেন এবং দুম্বা কুরবানি
হয়ে যায়৷ঈদুল
আজহা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় হযরত ইব্রাহিম
(আ.)-এর সেই অতুলনীয়
ত্যাগের কথা, যখন তিনি
আল্লাহর নির্দেশে নিজের সবচেয়ে প্রিয় পুত্রকে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত হয়েছিলেন।
আল্লাহর নির্দেশ পালনে হযরত ইব্রাহিম (আ.)
আনুগত্যের যে নজির স্থাপন
করেছিলেন, সেটিই কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের জন্য ত্যাগের সর্বোচ্চ
শিক্ষা। এটি আজও সমান
প্রাসঙ্গিক, আল্লাহর ভালোবাসার কাছে দুনিয়ার সবকিছুই
তুচ্ছ।
কুরবানি করার সময় লক্ষ্যণীয় বিষয়কুরবানি
হলো আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট দিনে নির্ধারিত পশু
আল্লাহর নামে জবাই করা।
এটি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত-যা ত্যাগ, আনুগত্য
ও তাকওয়ার শিক্ষা দেয়। ১০ জিলহজ্জ
ঈদের নামাজের পর হতে ১২ই
জিলহজ্জ সন্ধ্যা পর্যন্ত, এই তিনদিন কুরবানি
করার সময়। কুরবানি করার
সময় পশুকে কিবলামুখী করে মাথার দিক
দক্ষিণে রেখে শুইয়ে কুরবানি
করতে হবে। তবে এক্ষেত্রে
নিয়তের ব্যাপারে বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে।রাসূল
(স.) বলেন, 'নিশ্চয়ই সব কাজ নিয়তের
উপর নির্ভরশীল।'( সহিহ বুখারি, হাদিস:
১)
সালাত ও কুরবানির আন্ত:সম্পর্কপবিত্র
কুরআনে সালাত ও কুরবানিকে বেশ
কিছু আয়াতে একসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন:'অতএব
তুমি তোমার রবের উদ্দেশ্যে সালাত
আদায় করো এবং কুরবানি
করো।'(সূরা আল-কাওসার,
আয়াত ২)।এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা একসঙ্গে দুটি মহান ইবাদতের
কথা বলেছেন, সালাত ও কুরবানি। মুসলমান
স্কলারদের মতে মুমিনদের উদ্দেশ্যে
আল্লাহ তায়ালা এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা
দিয়েছেন। সালাত যেমন একমাত্র আল্লাহর
জন্য আদায় করতে হয়,
তেমনি কুরবানিও হতে হবে শুধুমাত্র
আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে। লোক দেখানো, সামাজিক
মর্যাদা বা অন্য কোনো
উদ্দেশ্য এক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নয়। পবিত্র কুরআনে
আল্লাহ তাআলা বলেন,“বলুন,
নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার
কুরবানি, আমার জীবন ও
আমার মৃত্যু—সবই বিশ্বজগতের প্রতিপালক
আল্লাহর জন্য।”( সূরা আল-আন‘আম: ১৬২)এই আয়াত একজন মুসলিমের
জীবনের মূল দর্শনকেই তুলে
ধরে। ইবাদত থেকে শুরু করে
জীবনের প্রতিটি কাজ হতে হবে
একমাত্র আল্লাহকেন্দ্রিক। কুরবানিও এর ব্যতিক্রম নয়।
কুরবানি, হজ ও আত্মসমর্পনের শিক্ষাকুরবানি
এবং হজ ইসলামের এই
দুই মহান ইবাদত একে
অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। উভয়ের মূল শিক্ষা হলো
মহান আল্লাহর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ।
হজ যেমন মানুষকে দুনিয়াবি
অহংকার, ভেদাভেদ ও আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে
মুক্ত হতে শেখায়, তেমনি
কুরবানি বান্দাকে নিজের সবচেয়ে প্রিয় বস্তুকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ করতে
শেখায়। হজের প্রতিটি ধাপ
আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় হযরত
ইব্রাহিম (আ.), হযরত হাজেরা
(আ.) ও হযরত ইসমাইল
(আ.) এর আত্মত্যাগের ইতিহাসে।
সাফা-মারওয়ার মধ্যবর্তী স্থানে সাঁই করা মনে
করিয়ে দেয় হাজেরা (আ.)-এর অসীম ধৈর্য,
আর মিনায় কুরবানি স্মরণ করিয়ে দেয় ইবরাহিম (আ.)-এর আনুগত্য ও
ইসমাঈল (আ.)-এর আত্মসমর্পণ।হজের
ইহরাম মানুষকে মর্যাদা, সম্পদ ও পরিচয়ের অহংকার
ত্যাগ করতে শেখায়। হজের
সময় একই পোশাকে ধনী-গরিব সবাই দাঁড়ায়
এক কাতারে। আর কুরবানি শেখায়,
আল্লাহর পথে ত্যাগ ছাড়া
প্রকৃত ঈমান পূর্ণতা পায়
না। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না
এগুলোর গোশত ও রক্ত;
বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।'( সূরা আল-হাজ্জ:
৩৭)অর্থাৎ,
কুরবানি কেবল পশু জবাইয়ের
আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি
হৃদয়ের পরিশুদ্ধি ও তাকওয়ার পরীক্ষা।
হজও তাই। এটি শুধু
সফর নয়, বরং আত্মশুদ্ধির
এক মহাসাধনা।আজ আমাদের সমাজে কুরবানির অনেক আয়োজন থাকলেও
ত্যাগের চেতনা অনেক সময় অনুপস্থিত।
হজেও ভীড় বাড়ছে, কিন্তু
আত্মসমর্পণের শিক্ষা হৃদয়ে কতটা জায়গা পাচ্ছে
প্রশ্ন থেকে যায়। অথচ
এই দুই ইবাদতের প্রকৃত
উদ্দেশ্যই হলো মানুষকে আল্লাহমুখী
করা, বিনয়ী করা এবং দুনিয়ার
মোহ থেকে মুক্ত করা।
বর্তমান প্রাসঙ্গিকতায় কুরবানির শিক্ষা ও উত্তরণের উপায়বর্তমান
সময়ে কুরবানির ইবাদত অনেক ক্ষেত্রেই বাহ্যিকতা
ও প্রদর্শনের প্রতিযোগিতায় রূপ নিচ্ছে। কে
কত বড় গরু দিল,
কত দামে কিনল, কিংবা
সামাজিক মাধ্যমে কার আয়োজন বেশি
আকর্ষণীয় এসব আলোচনায় অনেক
সময় হারিয়ে যায় কুরবানির প্রকৃত
উদ্দেশ্য। অথচ আল্লাহ তাআলা
স্পষ্টভাবে বলেছেন, বান্দার তাকওয়া ব্যতীত কিছুই তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য
হবে না।কুরবানি
তাই কেবল পশু জবাইয়ের
মাধ্যমেই সমপন্ন হয় না, বরং
নিজের অহংকার, লোভ, হিংসা ও
স্বার্থপরতাকে জবাই করাও কুরবানির
শিক্ষা। একজন মানুষ যখন
আল্লাহর সন্তুষ্টিকে নিজের ইচ্ছার উপরে স্থান দেয়,
তখনই কুরবানির প্রকৃত সৌন্দর্য ফুটে ওঠে।কুরবানি
করার পূর্বে তাই আমাদের ভাবতে
হবে, আমরা কি কুরবানিকে
ইবাদত হিসেবে পালন করছি, নাকি
সামাজিক পরিচয়ের অংশ হিসেবে? আমাদের
নিয়ত কি আল্লাহর জন্য,
নাকি মানুষের প্রশংসার জন্য? কারণ প্রতিটি আমলের
মূল্য নির্ধারিত হয় নিয়তের উপর।
রাসূল (সা.) তার উম্মতদের
নিয়তের ব্যাপারে বিশেষভাবে সতর্ক করেছেন। কেননা কুরবানির উদ্দেশ্য কেবল পশু নয়,
মূল বিষয় হচ্ছে বান্দার
অন্তরের ইখলাস ও আল্লাহভীতি।তাই
এবারের কুরবানিতে আমরা লোক দেখানো
প্রতিযোগিতা থেকে দূরে থাকি।
আমাদের কুরবানি হোক নিখাদ ইখলাসের
প্রতিচ্ছবি। লোক দেখানো ইবাদত
নয়, প্রতিযোগিতা নয়, কেবল মহান
রবের সন্তুষ্টিই হোক আমাদের একমাত্র
উদ্দেশ্য। তবেই কুরবানির রক্তে
জীবন্ত হবে তাকওয়ার শিক্ষা,
আর ঈদ হয়ে উঠবে
আত্মশুদ্ধির এক অনন্য উপলক্ষ। নাবিলা বিনতে হারুনশিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
কার্যকরী সদস্য, জাকসু।
কপিরাইট © ২০২৬ ধ্রুবকন্ঠ | Dhruba Kantho । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত